Thursday, November 21, 2019

ফোয়ারার ভেলকি


আজকের জলৎস্‌বর্গ
অস্ট্রিয়ার জলৎস্‌বর্গ। সঙ্গীতের শহর। একদিকে যেমন মোসার্টের জন্মস্থান, অন্যদিকে এই শহরেই থাকতেন "দ্য সাউন্ড অফ মিউজিক" খ্যাত ফন ট্রাপ পরিবার। তবে সঙ্গীতের পাশাপাশি এ শহর প্রাসাদেরও। মিরাবেল প্যালেস অথবা হোহেনজলৎস্‌বর্গ দূর্গ, কম যায় না কোনোটাই। মিরাবেল প্যালেসের বিশাল বাগানেই শ্যুট করা হয় "ডো-রে-মি" গানের শেষ অংশ।

মিরাবেল প্যালেস
তবে আজকের গল্প শহরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত হেলব্রুন প্যালেসের। ১৬১৩ সাল। জলৎস্‌বর্গের দায়িত্বে তখন প্রিন্স-আর্চবিশপ মার্কাস হোহেনহেমস। ধর্মীয় আচারবিধি ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা, দুইয়ের দায়িত্ব একসাথে যাঁরা পালন করতেন তাদের বলা হত প্রিন্স-আর্চবিশপ। এই মার্কাস ঠিক করলেন শহরের উপকন্ঠে গ্রীষ্মকালীন অবসর যাপনের জন্য বানাবেন এক বিলাসবহুল প্রাসাদ। দায়িত্ব দেওয়া হল ইতালিয় স্থপতি সান্তিনো সোলারিকে।

হেল্ব্রুন প্যালেস
মার্কাস রসিক লোক ছিলেন। প্রাসাদের অতিথিদের সঙ্গে  মজা করবার জন্য তিনি বাগানে প্রচুর লুকনো ফোয়ারা বসাবার পরিকল্পনা করলেন। কখন যে কোথা থেকে জল এসে কাকে ভিজিয়ে দেবে তা কল্পনাও করা সম্ভব না। যেমন পুকুরের সামনে বিশাল এক পাথরের খাবার টেবিল। তাকে ঘিরে গোল করে পাথরের বসার জায়গা। এলাহি খাওয়াদাওয়া আর পানের পর অতিথিরা যখন কিঞ্চিৎ ঢুলছেন, বসার জায়গার নিচ থেকে জল ছড়াতে শুরু করল লুকনো ফোয়ারা। বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটবার সময় কখনো গাছের পিছন থেকে, কখনো কোন মূর্তির গায়ের লুকোনো কোন ফাঁক দিয়ে বা কখনো সিঁড়ির ধাপ থেকে বেরিয়ে আসবে জল।

খাবার টেবিলে ফোয়ারা
একটা ঘরে ফোয়ারার উপরে বসানো আছে একটি মুকুট।  ফোয়ারার জোর কমালে বাড়ালে জলের উপর নেচে বেড়ায় সেই মুকুট। এইভাবেই বোঝানো হয়েছে ক্ষমতার উত্থান পতন। আর আছে ২০০টি অংশবিশিষ্ট এক পাপেট থিয়েটার, যাতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজনের দৈনিক জীবনযাপন দেখানো হয়েছে। এই থিয়েটারের সঙ্গীত থেকে সব অংশের নড়াচড়া, পুরোটাই জলের তোড় কাজে লাগিয়ে করানো হয়। এই সব জলের কারিকুরির মধ্যে একেকটা জায়গা এমন আছে, যেখানে দাঁড়ালে কোনোদিকের কোন জলই গায়ে লাগবে না। অতিথিদের নিয়ে ঘোরবার সময় এই জায়গা ধরেই হাঁটতেন মার্কাস। তাই তিনি নিজে থাকতেন সম্পুর্ন শুকনো। আজ ট্যুরিস্টদের ঘুরিয়ে দেখানোর সময় এখানেই দাঁড়ান গাইডেরা। আর তাই, একটুও না ভিজে আজও দেখা যায়না এই মজাদার ফোয়ারার ভেলকি।

পাপেট থিয়েটার
এত খরচা করে বানানো এই প্রাসাদের সব থেকে বিস্ময়কর বেপার হল, এখানে একটাও শোবার ঘর নেই। মার্কাস সন্ধ্যেবেলার মধ্যে ফিরে যেতেন জলৎস্‌বর্গ। শুধুমাত্র দিনের বেলা এসে আমোদ প্রমোদের জন্য বানানো হয়েছিল এই বিশাল প্রাসাদ।

"সিক্সটিন গোয়িং অন সেভেন্টিন" গানের প্যাভেলিয়ন
শুরু করেছিলাম একটা গান দিয়ে। শেষ করব ওই সিনেমার আরেকটা বিখ্যাত গান দিয়ে। ফন ট্রাপ পরিবারের বড় মেয়ে লিজল ও রলফের সেই বিখ্যাত গান "সিক্সটিন গোইং অন সেভেনটিন" -এ যেই কাঁচের ঘরে তাদের নাচতে দেখা যায় মনে আছে তো? জলৎস্‌বর্গে শুটিং এর জন্য যেটা বানানো হয় সেটা অপেক্ষাকৃত ছোট। পরে ভিতরের শুটিং এর জন্য বড় করে আরেকটা বানানো হওয় স্টুডিওতে। ছোটটা থেকে যায় এই শহরেই। প্রথমে সেটা রাখা হওয় লিওপোল্ড প্রাসাদের ভিতরে, যেখানে ফন ট্রাপ বাড়ির লেকের দৃশ্যগুলি তোলা হয়েছিল। কিন্তু অসুবিধে হতে থাকে যখন সিনেমার ভক্তরা পাঁচিল পর্যন্ত টপকাতে শুরু করে এটা দেখবার জন্য। তখন এটা নিয়ে আসা হয় এই হেলব্রুন প্রাসাদের বাইরের বাগানে। প্রাসাদের টিকেট না কেটেই এখন দিব্যি দেখা সম্ভব এটি।

Wednesday, November 20, 2019

সানেন চার্চের গল্প

সানেন গ্রামের এয়ারফিল্ড
সুইৎজারল্যান্ড এমনিতেই ছবির মতন দেশ। তার উপর ঢেউ খেলানো সবুজ মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা কাঠের বাড়ি, বা শ্যালে, আর মাথায় চোঙা বসানো চার্চগুলো দেখলে মনে হয় ট্রেন থেকে নেমে হেঁটেই ঘুরি সব। এরকমই এক শ্যালে ভর্তি গ্রামের চোঙা বসানো চার্চের গল্প বলব আজকে।

সানেন চার্চ
সানেন গ্রামের এই চার্চ বেশ পুরনো। কবে তৈরি করা হয়েছিল তা ঠিকঠাক বলা না গেলেও ১২২৮ সালের লেখায় এখানে চার্চের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এখন যেটা আমরা দেখতে পাই তার নির্মানকাল ১৪৪০ এর দশক। এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বড়সড় করে নতুন ভাবে এটা বানানো হয়। আর এই সময়েই আঁকা হয় এর দেওয়ালের অপূর্ব মুর‍্যালগুলি। মেরির জীবনী, যাঁর নামে এই চার্চ, সেই সেন্ট মরিস ও তাঁর থিবান সৈন্যবাহিনীর কথা ( খ্রিষ্টধর্ম গ্রহন করার জন্য রোম এদের ৬৬৬৬ জনকে মৃত্যুদন্ড দেয় ২৮৬ সালে), ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনি, এই সবই আঁকা আছে চার্চের দেওয়ালে।

সানেন চার্চের মুর‍্যাল
১৫৫৬ সালে ক্যাথলিকদের হাত থেকে এই চার্চ চলে যায় প্রটেস্টান্টদের হাতে। ওল্টার, মূর্তি সব সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৬০৪ সালে সাদা রঙ করে ঢেকে দেওয়া হয় মুর‍্যালগুলিও। তিনশ বছরের উপর কেটে যায় এইভাবে। ১৯৪০ এর জুন মাসে বাজ পরে চার্চের টাওয়ারে। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ভেঙ্গে পড়ে বেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলেও সবার চেষ্টায় ১৯৪২ সালে আবার গড়ে তোলা হয় চার্চ। নতুন বেলও লাগানো হয় পরে। এর আগে ১৯২৭ সালে সাদা রঙ তুলে বের করে আনা হয়েছে সেই পুরনো মুর‍্যালগুলিও। বহুদিন বাদে স্বমহিমায় ফিরে আসে এই সুন্দর চার্চটি।

ইহুদী মেনুহিন
এর মধ্যে সানেন আর পাশের গ্রাম স্তাদে খুলেছে স্কি রিসর্ট। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ট্যুরিজম, খুলছে বিলাসবহুল সব হোটেল। দেখা যাচ্ছে বিখ্যাত সব লোকেদের। তাদের মধ্যে অনেকেই বাড়ি বানাচ্ছেন এখানে। কিন্তু তবুও, এত কিছুর পরেও সুইৎজারল্যান্ডের ছোট্ট এক গ্রামের অনামী সুন্দর একটি চার্চ হয়েই রয়ে যেত এটি। যদি না ১৯৫৭ সালে এখানে এসে আস্তানা গাড়তেন প্রখ্যাত বেহালাবাদক ও সঞ্চালক ইহুদী মেনুহিন। ওই বছরই মেনুহিন চালু করলেন স্তাদ মেনুহিন ফেস্টিভাল। সানেন চার্চে হল তার প্রথম পরিবেশনা। তার পর থেকে আজ অবধি বিখ্যাত সব সংগীতজ্ঞ এসেছেন এই উৎসবে। বর্তমানে সানেন ছাড়াও আশেপাশের আরো কিছু গ্রামের চার্চ ও অন্য জায়গা মিলিয়ে অনেকদিন ধরে চলে এই উৎসব। ইউটিউবে খুঁজলেই দেখা সম্ভব বেশ কিছু ভিডিও।

সানেন স্টেশন

স্টেশনের পাশের ব্রিজ
অবশ্য যারা বলিউডি সিনেমার ভক্ত, তাদের কাছে সানেনের গুরুত্ব অন্য। কারন এই সানেন, স্তাদ আর আশেপাশের কিছু জায়গাতেই তোলা হয় "দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে"-র ইউরোপ ভ্রমণের বেশিরভাগটাই। এই সানেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসেই  সিমরান জানায় তার বিয়ের খবর। আরেকটু এগোলে সানেন এয়ারফিল্ড। সিনেমার শুরুতে "মেরে খাবোঁ মে জো আয়ে" গানে এখানেই ছোট প্লেনের পাশে দৌড়তে দেখা যায় রাজকে। একটু পিছিয়ে, স্টেশন থেকে শখানেক মিটার দুরে, সেই "পালাট" ব্রিজ।  ব্রিজের উল্টোদিকের বাস স্টেশন থেকেই বাস ধরে দুজনে।  আর তার আগে যেই সুন্দর চার্চটা দেখতে পায় সিমরান, সেটাই এই সানেন চার্চ। ভিতরের শ্যুটিং অবশ্য করা হয় মুবভঁ নামে অন্য একটি গ্রামের চার্চে।

মুবভঁ গ্রামের চার্চ

Monday, November 18, 2019

হোটেলের মধ্যে বাড়ি

বাড়ির মধ্যে হোটেল সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে সস্তা হোটেল বা হোস্টেলের ক্ষেত্রে এটাই বরং নিয়ম। কিন্তু হোটেলের মাঝখানে বাড়ি? তাও আবার কেতাদুরস্ত, ঝাঁ চকচকে হোটেল! হ্যাঁ, এরকমও হয় বটে।

১৮৮০র দশক। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী অমস্টেরডমে তৈরী হচ্ছে নতুন রেল স্টেশন অমস্টেরডম সেন্ট্রাল। এই সময়ে জর্মন স্থপতি হেঙ্কেনহাফের মাথায় আসে এক বিলাসবহুল হোটেল বানানোর পরিকল্পনা। জায়গাও পছন্দ হতে দেরী হয়না। নতুন রেল স্টেশনের একদম উল্টোদিকেই এই হোটেল বানাবেন বলে ঠিক করেন হেঙ্কেনহাফ। দোমরাখ আর প্রিন্স হেন্দ্রিকাদে নামে দুটো বড় রাস্তার সংযোগস্থলের বাড়িগুলি কিনে নিতে থাকেন উনি। আর ঝামেলার শুরু হয় এখান থেকেই।

অমস্টেরডম সেন্ট্রাল

৪৫ এবং ৪৭ নম্বর প্রিন্স হেন্দ্রিকাদের দুই বাড়ির মালিক বেঁকে বসেন। এর মধ্যে একটা ছিল শুরিখানা, অন্যটা এক তাঁতির। সামনে রেল স্টেশন হচ্ছে, জায়গার দাম যে বাড়তে চলেছে, তা বুঝে বাকি সব বাড়ি যেই দামে বিক্রি হয়েছে, সেই দামে না করে দেন শুঁড়িখানার মালিক। বুঝিয়ে দলে টানেন প্রতিবেশীকেও। চলতে থাকে টানাপোড়েন। ওদিকে দুটো বাড়িই এমন জায়গায় যে না ভাঙলে হোটেল করা সম্ভব নয়।

অবশেষে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে হেঙ্কেনহাফের। তৈরী হয় নতুন প্ল্যান।ওই দুটো বাড়ী রেখেই, তাদের ঘিরে শুরু হয় হোটেল বানানো। ঠিক কত টাকা তাঁদের মাথায় ছিল বা হোটেল মালিকের পক্ষে সত্যিই তা দেওয়া সম্ভব ছিল কিনা এখন আর হয়ত বলা সম্ভব নয়। তবে ইতিহাস বলে নেদারল্যান্ডসে এই ভিক্টোরিয়া হোটেলেই প্রথম সব ঘর সমেত পুরো বাড়িতেই ইলেক্ট্রিক আলো লাগানো হয়েছিলো। এখানে থেকে গেছেন নর্তকী-গুপ্তচর মাতা হারি থেকে ইংলিশ হেভি মেটাল ব্যান্ড আইরন মেডেন। আর অমস্টেরডমে ঘুরতে আসা লক্ষ লক্ষ লোকের সামনে আজও দাঁড়িয়ে আছে ৪৫ এবং ৪৭ নম্বর প্রিন্স হেন্দ্রিকাদের দুটি বাড়ি, বর্তমানে স্যুভেনির শপ হয়ে। মনে হয় হোটেলের দেওয়ালটা ঠেলে ঢুকিয়ে যেন বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের।

ভিক্টোরিয়া হোটেল

১৯৯৯ সালে এই ঘটনা নিয়ে একটি উপন্যাস লেখেন থমাস রসেনবুম। ২০১৫ সালে তার উপর বানানো হয় সিনেমা। ইংরেজিতে "আ নোবল ইন্টেনশন" নামের সিনেমাটি নেটফ্লিক্সে পাওয়া যাবে।

৪৫ এবং ৪৭ নম্বর প্রিন্স হেন্দ্রিকাদের দুই বাড়ি

তবে এই ঘটনার সব থেকে ভালো দিকটা হল এই বাড়িদুটোর টিকে যাওয়া। আজ যেখানে প্রোমোটারদের অত্যাচারে ইচ্ছে না থাকলেও সব ছেড়ে দিতে হয়, সেখানে এত বড় একটা নির্মান সংস্থার বিরুদ্ধে লড়েও যে, জেতা না হোক, খাঁড়া থাকা যায়, তার প্রমান এই দুটো বাড়ি।