Thursday, November 21, 2019

ফোয়ারার ভেলকি


আজকের জলৎস্‌বর্গ
অস্ট্রিয়ার জলৎস্‌বর্গ। সঙ্গীতের শহর। একদিকে যেমন মোসার্টের জন্মস্থান, অন্যদিকে এই শহরেই থাকতেন "দ্য সাউন্ড অফ মিউজিক" খ্যাত ফন ট্রাপ পরিবার। তবে সঙ্গীতের পাশাপাশি এ শহর প্রাসাদেরও। মিরাবেল প্যালেস অথবা হোহেনজলৎস্‌বর্গ দূর্গ, কম যায় না কোনোটাই। মিরাবেল প্যালেসের বিশাল বাগানেই শ্যুট করা হয় "ডো-রে-মি" গানের শেষ অংশ।

মিরাবেল প্যালেস
তবে আজকের গল্প শহরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত হেলব্রুন প্যালেসের। ১৬১৩ সাল। জলৎস্‌বর্গের দায়িত্বে তখন প্রিন্স-আর্চবিশপ মার্কাস হোহেনহেমস। ধর্মীয় আচারবিধি ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা, দুইয়ের দায়িত্ব একসাথে যাঁরা পালন করতেন তাদের বলা হত প্রিন্স-আর্চবিশপ। এই মার্কাস ঠিক করলেন শহরের উপকন্ঠে গ্রীষ্মকালীন অবসর যাপনের জন্য বানাবেন এক বিলাসবহুল প্রাসাদ। দায়িত্ব দেওয়া হল ইতালিয় স্থপতি সান্তিনো সোলারিকে।

হেল্ব্রুন প্যালেস
মার্কাস রসিক লোক ছিলেন। প্রাসাদের অতিথিদের সঙ্গে  মজা করবার জন্য তিনি বাগানে প্রচুর লুকনো ফোয়ারা বসাবার পরিকল্পনা করলেন। কখন যে কোথা থেকে জল এসে কাকে ভিজিয়ে দেবে তা কল্পনাও করা সম্ভব না। যেমন পুকুরের সামনে বিশাল এক পাথরের খাবার টেবিল। তাকে ঘিরে গোল করে পাথরের বসার জায়গা। এলাহি খাওয়াদাওয়া আর পানের পর অতিথিরা যখন কিঞ্চিৎ ঢুলছেন, বসার জায়গার নিচ থেকে জল ছড়াতে শুরু করল লুকনো ফোয়ারা। বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটবার সময় কখনো গাছের পিছন থেকে, কখনো কোন মূর্তির গায়ের লুকোনো কোন ফাঁক দিয়ে বা কখনো সিঁড়ির ধাপ থেকে বেরিয়ে আসবে জল।

খাবার টেবিলে ফোয়ারা
একটা ঘরে ফোয়ারার উপরে বসানো আছে একটি মুকুট।  ফোয়ারার জোর কমালে বাড়ালে জলের উপর নেচে বেড়ায় সেই মুকুট। এইভাবেই বোঝানো হয়েছে ক্ষমতার উত্থান পতন। আর আছে ২০০টি অংশবিশিষ্ট এক পাপেট থিয়েটার, যাতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজনের দৈনিক জীবনযাপন দেখানো হয়েছে। এই থিয়েটারের সঙ্গীত থেকে সব অংশের নড়াচড়া, পুরোটাই জলের তোড় কাজে লাগিয়ে করানো হয়। এই সব জলের কারিকুরির মধ্যে একেকটা জায়গা এমন আছে, যেখানে দাঁড়ালে কোনোদিকের কোন জলই গায়ে লাগবে না। অতিথিদের নিয়ে ঘোরবার সময় এই জায়গা ধরেই হাঁটতেন মার্কাস। তাই তিনি নিজে থাকতেন সম্পুর্ন শুকনো। আজ ট্যুরিস্টদের ঘুরিয়ে দেখানোর সময় এখানেই দাঁড়ান গাইডেরা। আর তাই, একটুও না ভিজে আজও দেখা যায়না এই মজাদার ফোয়ারার ভেলকি।

পাপেট থিয়েটার
এত খরচা করে বানানো এই প্রাসাদের সব থেকে বিস্ময়কর বেপার হল, এখানে একটাও শোবার ঘর নেই। মার্কাস সন্ধ্যেবেলার মধ্যে ফিরে যেতেন জলৎস্‌বর্গ। শুধুমাত্র দিনের বেলা এসে আমোদ প্রমোদের জন্য বানানো হয়েছিল এই বিশাল প্রাসাদ।

"সিক্সটিন গোয়িং অন সেভেন্টিন" গানের প্যাভেলিয়ন
শুরু করেছিলাম একটা গান দিয়ে। শেষ করব ওই সিনেমার আরেকটা বিখ্যাত গান দিয়ে। ফন ট্রাপ পরিবারের বড় মেয়ে লিজল ও রলফের সেই বিখ্যাত গান "সিক্সটিন গোইং অন সেভেনটিন" -এ যেই কাঁচের ঘরে তাদের নাচতে দেখা যায় মনে আছে তো? জলৎস্‌বর্গে শুটিং এর জন্য যেটা বানানো হয় সেটা অপেক্ষাকৃত ছোট। পরে ভিতরের শুটিং এর জন্য বড় করে আরেকটা বানানো হওয় স্টুডিওতে। ছোটটা থেকে যায় এই শহরেই। প্রথমে সেটা রাখা হওয় লিওপোল্ড প্রাসাদের ভিতরে, যেখানে ফন ট্রাপ বাড়ির লেকের দৃশ্যগুলি তোলা হয়েছিল। কিন্তু অসুবিধে হতে থাকে যখন সিনেমার ভক্তরা পাঁচিল পর্যন্ত টপকাতে শুরু করে এটা দেখবার জন্য। তখন এটা নিয়ে আসা হয় এই হেলব্রুন প্রাসাদের বাইরের বাগানে। প্রাসাদের টিকেট না কেটেই এখন দিব্যি দেখা সম্ভব এটি।

Wednesday, November 20, 2019

সানেন চার্চের গল্প

সানেন গ্রামের এয়ারফিল্ড
সুইৎজারল্যান্ড এমনিতেই ছবির মতন দেশ। তার উপর ঢেউ খেলানো সবুজ মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা কাঠের বাড়ি, বা শ্যালে, আর মাথায় চোঙা বসানো চার্চগুলো দেখলে মনে হয় ট্রেন থেকে নেমে হেঁটেই ঘুরি সব। এরকমই এক শ্যালে ভর্তি গ্রামের চোঙা বসানো চার্চের গল্প বলব আজকে।

সানেন চার্চ
সানেন গ্রামের এই চার্চ বেশ পুরনো। কবে তৈরি করা হয়েছিল তা ঠিকঠাক বলা না গেলেও ১২২৮ সালের লেখায় এখানে চার্চের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এখন যেটা আমরা দেখতে পাই তার নির্মানকাল ১৪৪০ এর দশক। এলাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বড়সড় করে নতুন ভাবে এটা বানানো হয়। আর এই সময়েই আঁকা হয় এর দেওয়ালের অপূর্ব মুর‍্যালগুলি। মেরির জীবনী, যাঁর নামে এই চার্চ, সেই সেন্ট মরিস ও তাঁর থিবান সৈন্যবাহিনীর কথা ( খ্রিষ্টধর্ম গ্রহন করার জন্য রোম এদের ৬৬৬৬ জনকে মৃত্যুদন্ড দেয় ২৮৬ সালে), ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনি, এই সবই আঁকা আছে চার্চের দেওয়ালে।

সানেন চার্চের মুর‍্যাল
১৫৫৬ সালে ক্যাথলিকদের হাত থেকে এই চার্চ চলে যায় প্রটেস্টান্টদের হাতে। ওল্টার, মূর্তি সব সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৬০৪ সালে সাদা রঙ করে ঢেকে দেওয়া হয় মুর‍্যালগুলিও। তিনশ বছরের উপর কেটে যায় এইভাবে। ১৯৪০ এর জুন মাসে বাজ পরে চার্চের টাওয়ারে। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ভেঙ্গে পড়ে বেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলেও সবার চেষ্টায় ১৯৪২ সালে আবার গড়ে তোলা হয় চার্চ। নতুন বেলও লাগানো হয় পরে। এর আগে ১৯২৭ সালে সাদা রঙ তুলে বের করে আনা হয়েছে সেই পুরনো মুর‍্যালগুলিও। বহুদিন বাদে স্বমহিমায় ফিরে আসে এই সুন্দর চার্চটি।

ইহুদী মেনুহিন
এর মধ্যে সানেন আর পাশের গ্রাম স্তাদে খুলেছে স্কি রিসর্ট। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ট্যুরিজম, খুলছে বিলাসবহুল সব হোটেল। দেখা যাচ্ছে বিখ্যাত সব লোকেদের। তাদের মধ্যে অনেকেই বাড়ি বানাচ্ছেন এখানে। কিন্তু তবুও, এত কিছুর পরেও সুইৎজারল্যান্ডের ছোট্ট এক গ্রামের অনামী সুন্দর একটি চার্চ হয়েই রয়ে যেত এটি। যদি না ১৯৫৭ সালে এখানে এসে আস্তানা গাড়তেন প্রখ্যাত বেহালাবাদক ও সঞ্চালক ইহুদী মেনুহিন। ওই বছরই মেনুহিন চালু করলেন স্তাদ মেনুহিন ফেস্টিভাল। সানেন চার্চে হল তার প্রথম পরিবেশনা। তার পর থেকে আজ অবধি বিখ্যাত সব সংগীতজ্ঞ এসেছেন এই উৎসবে। বর্তমানে সানেন ছাড়াও আশেপাশের আরো কিছু গ্রামের চার্চ ও অন্য জায়গা মিলিয়ে অনেকদিন ধরে চলে এই উৎসব। ইউটিউবে খুঁজলেই দেখা সম্ভব বেশ কিছু ভিডিও।

সানেন স্টেশন

স্টেশনের পাশের ব্রিজ
অবশ্য যারা বলিউডি সিনেমার ভক্ত, তাদের কাছে সানেনের গুরুত্ব অন্য। কারন এই সানেন, স্তাদ আর আশেপাশের কিছু জায়গাতেই তোলা হয় "দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে"-র ইউরোপ ভ্রমণের বেশিরভাগটাই। এই সানেন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসেই  সিমরান জানায় তার বিয়ের খবর। আরেকটু এগোলে সানেন এয়ারফিল্ড। সিনেমার শুরুতে "মেরে খাবোঁ মে জো আয়ে" গানে এখানেই ছোট প্লেনের পাশে দৌড়তে দেখা যায় রাজকে। একটু পিছিয়ে, স্টেশন থেকে শখানেক মিটার দুরে, সেই "পালাট" ব্রিজ।  ব্রিজের উল্টোদিকের বাস স্টেশন থেকেই বাস ধরে দুজনে।  আর তার আগে যেই সুন্দর চার্চটা দেখতে পায় সিমরান, সেটাই এই সানেন চার্চ। ভিতরের শ্যুটিং অবশ্য করা হয় মুবভঁ নামে অন্য একটি গ্রামের চার্চে।

মুবভঁ গ্রামের চার্চ

Monday, November 18, 2019

হোটেলের মধ্যে বাড়ি

বাড়ির মধ্যে হোটেল সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে আছে। বিশেষ করে সস্তা হোটেল বা হোস্টেলের ক্ষেত্রে এটাই বরং নিয়ম। কিন্তু হোটেলের মাঝখানে বাড়ি? তাও আবার কেতাদুরস্ত, ঝাঁ চকচকে হোটেল! হ্যাঁ, এরকমও হয় বটে।

১৮৮০র দশক। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী অমস্টেরডমে তৈরী হচ্ছে নতুন রেল স্টেশন অমস্টেরডম সেন্ট্রাল। এই সময়ে জর্মন স্থপতি হেঙ্কেনহাফের মাথায় আসে এক বিলাসবহুল হোটেল বানানোর পরিকল্পনা। জায়গাও পছন্দ হতে দেরী হয়না। নতুন রেল স্টেশনের একদম উল্টোদিকেই এই হোটেল বানাবেন বলে ঠিক করেন হেঙ্কেনহাফ। দোমরাখ আর প্রিন্স হেন্দ্রিকাদে নামে দুটো বড় রাস্তার সংযোগস্থলের বাড়িগুলি কিনে নিতে থাকেন উনি। আর ঝামেলার শুরু হয় এখান থেকেই।

অমস্টেরডম সেন্ট্রাল

৪৫ এবং ৪৭ নম্বর প্রিন্স হেন্দ্রিকাদের দুই বাড়ির মালিক বেঁকে বসেন। এর মধ্যে একটা ছিল শুরিখানা, অন্যটা এক তাঁতির। সামনে রেল স্টেশন হচ্ছে, জায়গার দাম যে বাড়তে চলেছে, তা বুঝে বাকি সব বাড়ি যেই দামে বিক্রি হয়েছে, সেই দামে না করে দেন শুঁড়িখানার মালিক। বুঝিয়ে দলে টানেন প্রতিবেশীকেও। চলতে থাকে টানাপোড়েন। ওদিকে দুটো বাড়িই এমন জায়গায় যে না ভাঙলে হোটেল করা সম্ভব নয়।

অবশেষে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে হেঙ্কেনহাফের। তৈরী হয় নতুন প্ল্যান।ওই দুটো বাড়ী রেখেই, তাদের ঘিরে শুরু হয় হোটেল বানানো। ঠিক কত টাকা তাঁদের মাথায় ছিল বা হোটেল মালিকের পক্ষে সত্যিই তা দেওয়া সম্ভব ছিল কিনা এখন আর হয়ত বলা সম্ভব নয়। তবে ইতিহাস বলে নেদারল্যান্ডসে এই ভিক্টোরিয়া হোটেলেই প্রথম সব ঘর সমেত পুরো বাড়িতেই ইলেক্ট্রিক আলো লাগানো হয়েছিলো। এখানে থেকে গেছেন নর্তকী-গুপ্তচর মাতা হারি থেকে ইংলিশ হেভি মেটাল ব্যান্ড আইরন মেডেন। আর অমস্টেরডমে ঘুরতে আসা লক্ষ লক্ষ লোকের সামনে আজও দাঁড়িয়ে আছে ৪৫ এবং ৪৭ নম্বর প্রিন্স হেন্দ্রিকাদের দুটি বাড়ি, বর্তমানে স্যুভেনির শপ হয়ে। মনে হয় হোটেলের দেওয়ালটা ঠেলে ঢুকিয়ে যেন বসিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের।

ভিক্টোরিয়া হোটেল

১৯৯৯ সালে এই ঘটনা নিয়ে একটি উপন্যাস লেখেন থমাস রসেনবুম। ২০১৫ সালে তার উপর বানানো হয় সিনেমা। ইংরেজিতে "আ নোবল ইন্টেনশন" নামের সিনেমাটি নেটফ্লিক্সে পাওয়া যাবে।

৪৫ এবং ৪৭ নম্বর প্রিন্স হেন্দ্রিকাদের দুই বাড়ি

তবে এই ঘটনার সব থেকে ভালো দিকটা হল এই বাড়িদুটোর টিকে যাওয়া। আজ যেখানে প্রোমোটারদের অত্যাচারে ইচ্ছে না থাকলেও সব ছেড়ে দিতে হয়, সেখানে এত বড় একটা নির্মান সংস্থার বিরুদ্ধে লড়েও যে, জেতা না হোক, খাঁড়া থাকা যায়, তার প্রমান এই দুটো বাড়ি।

Thursday, August 1, 2019

অবশেষে গুরু দেখা দিলেন


-       “হিঁইঁইঁইঁইঁইঁইঁইঁ”, তীব্র সাইরেনের মতন একটা চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলেন লালমোহনবাবু।

আগেরবার লন্ডনে এসে কিছুই প্রায় দেখা হয়নি বলে বেশ দুঃখ ছিলো ভদ্রলোকের। এবার তাই বেঙ্গলী ক্লাব থেকে আমাদের নিমন্ত্রণ করায় আর সুযোগ ছাড়েননি উনি। অনুষ্ঠানের পনেরো দিন আগেই আমরা পৌঁছে গিয়েছি রানীর শহরে। কোথায় কি দেখতে যাওয়া হবে সেই প্ল্যানটা বানাতে শুরু করেছিলেন লালমোহনবাবুই। তবে এডমান্ড হিলারির বাড়ি দেখতে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করায় ফেলুদা যখন বললো ওনার বাড়ি নিউজিল্যান্ডে, তার পর থেকেই উৎসাহ  হারিয়ে বাকিটা ফেলুদার ওপরেই পুরোপুরি ছেড়ে দেন ভদ্রলোক।

আজকে সকালে টাওয়ার অফ লন্ডন দেখে আমরা টেমসের ধারে এসে বসেছি। লালমোহনবাবু আমাদের জন্য ক্যারামেলাইজড বাদাম কিনে এনে বসে খুচরো গুনছিলেন। এমন সময়েই সেই তীব্র সাইরেনের মতন চিৎকার। ফিরে দেখি ভদ্রলোক একটা কয়েন হাতে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখদুটো প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।

-       “কি কান্ড ভাই তপেস! ফেলুবাবু!” পয়সাটা ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিলেন লালমোহনবাবু।

একটা পঞ্চাশ পেন্স। নতুন, বেশ চকচকে। রানীর মাথা আঁকা। কিন্তু ফেলুদা কয়েনটা ওল্টাতেই চমকে উঠলাম। প্রচন্ড চেনা একটা মুখ। সেই পৃথিবীবিখ্যাত টুপি আর পাইপ। ফেলুদার গুরু, শার্লক হোমস। 



-       “কি থ্রিলিং ব্যাপার বলুন তো মশাই! একটা গোটা পয়সা ওনার নামে। আর আমাদের দেখুন। না আপনি, না ব্যোমকেশবাবু, না শঙ্কুস্যার।”

-       “কার সঙ্গে কার তুলনা করছেন লালমোহনবাবু!”, ফেলুদা পয়সাটা ফেরত দিতে দিতে বললো। “এই কয়েনটার কথা এখানে আসবার আগেই পড়েছিলাম। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকি এই বছর। সেই উপলক্ষেই বের করা হয়েছে এটা।”

-       “ফেলুদা, সত্যজিতবাবুরও কিন্তু ১০০ হতে চলল। এই তো ২০২১ এই।”

ফেলুদা শুনে কিরকম উদাস হয়ে টেমসের দিকে তাকিয়ে বাদাম চিবোতে লাগল।

#বিলেতেফেলুদা #বাংলায়Blogবক





Thursday, April 25, 2019

বাঙালির বিলেত ভ্রমণ - ২ (ইপ্সুইচ)

ইপ্সুইচ শহর নয় ইপ্সুইচ গ্রামও নয় ইপ্সুইচ ছোট্ট, অথচ ঝকঝকে এক মফঃস্বল বড়, নামকরা দোকান কম নেই, তবে বেশিরভাগই বন্ধ হয়ে যায় ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে এমনকি বেশিরভাগ ক্যাফেও খোলা থাকে শুধু কিছু মুদিখানা, রেস্তোরা আর পাড়ায় পাড়ায় অগুনতি পাব এখানের পাব অনেকটা কলকাতার পাড়ার চায়ের দোকানের মতন অফিসপাড়ার কাজের ফাঁকের আড্ডা হোক বা দিনের শেষে বন্ধুবান্ধবদের সাথে গুলতানি, পাবই এদের আশা ভরসা

সবাই জানে ইংল্যান্ড মেঘলা ছিঁচকাঁদুনি আবহাওয়ার দেশ। তবে আমার ভাগ্য ভালো ইপ্সুইচ নেমে  দেখি আকাশ বেশ পরিষ্কার। বাস ষ্টেশন থেকেই সোজা পোস্ট অফিস। প্রথম কাজ, পারমিট হাতানো। রুম্পা সঙ্গে আছে। এতদিনে এ জায়গা ওর হাতের তালু হয়ে গেছে, অতএব জিপিএস দেখে  রাস্তা চেনার ঝক্কি নেই। নিশ্চিন্তে চারপাশ গিলতে গিলতে পা চালালাম।

বাস ষ্টেশনের একদিকে একটা মাল্টিপ্লেক্স, অন্যদিকে দোকান, রেস্তোরা। যে কোন আধুনিক জায়গা যেমন হয়। কিন্তু একটু এগোতেই আস্তে আস্তে পালটাতে থাকল পরিবেশ। একটা পুরনো গির্জা পেরিয়ে এলাম। বেশ কিছু ছোট ছোট বাড়ী। কাঠের, ব্যাকাচোরা। দেখেই বোঝা যায় অনেক পুরনো। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বেশিরভাগেরই নিচে দোকান বা রেস্তোরা। তার মাঝে মাঝে আধুনিক ইঁটের বাড়ী। পুরনো আর নতুনের বেশ সাবলীল সহাবস্থান। নতুন বাড়ীগুলো ছিমছাম, আরম্বরহীন। চোখের আরাম দেওয়ার দায়িত্ব পুরনোদের।

পুরনো বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা হোটেলের দোতলায় পোস্ট অফিস। বাইরেটা বেশ সুন্দর কারুকাজ করা। একতলা আর দোতলা নিয়ে WH Smith এর দোকান। নিচে কাগজ, পেন, পেন্সিল, ফোল্ডার, ম্যাগাজিন থেকে আরম্ভ করে আঠা, কাঁচি, স্টেপলার অবধি যাবতীয় স্কুল-অফিসের কাজের জিনিষ।  ওপরে বইয়ের দোকান। তারই একপাশে চারটে ছোট কাউন্টার পোস্ট অফিসের।

পারমিট হাতে আসতে লাগল মিনিট পাঁচেক। এতক্ষণে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত! বেড়িয়ে এলাম বাইরে। এই জায়গাটা ইপ্সুইচের কেন্দ্রস্থল। সোজা বাংলায় যাকে বলে টাউন সেন্টার। সোজা একটা রাস্তা, দুধারে দোকান, ব্যাঙ্ক, মল। গাড়ি ঢোকা বারণ, তাই আরামসে হেলেদুলে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে চলা যায়। চোখে পড়ল বুটস্‌ (লন্ডনে ফেলুদাতে প্রথম নাম পড়ি), সুপারড্রাগস। এগুলো মূলত ওষুধের দোকান। তবে প্রসাধন সামগ্রীই বেশি থাকে। চেনা নামের মধ্যে H&M, Marks and Spencers, Costa Coffee, Starbucks, Bodyshop। বেশ কটা outdoor sports এর দোকানএছাড়াও সস্তায় আলপিন থেকে হাতি কেনবার দোকান Poundland আর Poundworld. অনেকটা আমাদের হরেক মাল দশ টাকার মতন।

টাউন সেন্টার শেষ হতে শুরু হল আবাসিক এলাকা। টানা ছাঁচে ফেলা পরপর ছিমছাম সব বাড়ি। প্রধানত চার রকমের বাড়ি দেখলাম এই ইপ্সুইচে। এক, বাস স্টেশনের কাছাকাছি ও টাউন সেন্টারের  পাশে বেশ কিছু আধুনিক ফ্লাটবাড়ি। দুই, পরপর একে অন্যের সাথে জোড়া বাড়ি। দেখে মনে হবে লম্বা একটাই বাড়ি। কিন্তু ভালো করে দেখলে বোঝা যায় একটা ছাঁচের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। প্রতিটা আলাদা বাড়ি, শুধু দুটো বাড়ির মাঝের দেওয়াল একটাই। অনেকটা আমাদের উত্তর কলকাতার কিছু বাড়ির মতন। এগুলোকে বলে টেরেস হাউস। একদম দুই ধারের দুটো বাড়ি, যাদের খালি একপাশটাই জোড়া, সেগুলোকে বলে এন্ড অফ টেরেস। তিন, একসাথে জোড়া দুটো বাড়ি। টেরেসের মতনই, খালি বাড়ি দুটো। এগুলোকে সেমি ডিটাচড হাউস বলে। আর চার, একদম একলা বাড়ি বা ডিটাচড হাউস। পরে অবশ্য কিছু কটেজ আর বাংলোও চোখে পরেছে একটু বাইরের দিকে।

রুম্পা আমাদের জন্য যে এক কামরার ফ্লাটটা ভাড়া নিয়েছে সেটা একটা টেরেস হাউসে। এদেশ  কলকাতার মতন সমতল নয়। তাই রাস্তা হরদম উঠছে, নামছে। আমরা যেই বাড়িতে থাকব, তার সামনের রাস্তার থেকে পিছনের রাস্তা একতলা নিচু। সুতরাং সামনে থেকে যেটা একতলা, সেটা আসলে দোতলা। পাহাড়ে যেমন হয় আরকি। আমরা থাকব আসল একতলাতে, বা বেসমেন্টে। রাস্তা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে হবে। 

বাড়ি পৌছে প্রথম যেটা দেখে আঁতকে উঠলাম (আগের থেকে কিছুটা জানা ছিলো অবশ্য, তবে শোনা আর দেখার মধ্যে তো একটা পার্থক্য আছে, তাইনা?) সেটা হল প্রধান দরজা। মোটামুটি অর্ধেক কাঁচের। রাস্তা আর ঘরের মধ্যে শুধু একটাই দরজা, যার অর্ধেক কাঁচের! কালচার শক্ কি আর শুধু আমাদের দেশে আসলেই হয় রে পাগলা?

তবে ফ্ল্যাটখানা বেশ পছন্দ হল। একটা বড় ঘরের একদিকে খাট, অন্যদিকে দুটো আরামদায়ক সোফা, একটা ওয়াক ইন জামাকাপড় রাখার জায়গা। এটাও বেশ বড় এবং খুব সহজেই আমাদের স্যুটকেস, রুকস্যাক ইত্যাদির জায়গা হয়ে গেল। একটা ছোট শোবার ঘরের আয়তনের রান্নাঘর। এবং এটা যেহেতু পিছনের দিকে, দরজা খুললেই বাগান, আর না খুললেও ঘর ভরতি আলো। বাথ্রুমখানাও বেশ ভালো, তবে এদেশের যা নিয়ম। স্নানের জায়গা হোটেলের মতন একটা ঘেরা কাঁচের বাক্সতে। এবং সে বাক্সের আয়তন বড়ই ছোট। 

একটু হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে পরা গেল। আজ আর বাড়িতে খাওয়া দাওয়ার ব্যাপার নেই। রুম্পা আগে যেই মেয়েগুলোর সাথে থাকত, আমাদের রাতের খাবারের দায়িত্ব আজকে তারা নিয়েছে। টাউন সেন্টারের একদিকে আমাদের বাড়ি, অন্যদিকে ওদের। ধীরেসুস্তে হেঁটেও মিনিট কুড়ি বড়জোর।  মাঝে গ্রেগস থেকে একটু হট চকোলেট খেয়ে নেওয়া গেল। বেশ ভালো। প্রবাসকালে যেই কয়টা জায়গার কফি বা হট চকোলেট আমাদের ভালো লেগেছে, এটা তাদের অন্যতম। 

অসাধারণ দক্ষিণ ভারতীয় খাবার খেয়ে আর ভরপেট আড্ডা মেরে যখন বাড়ি ফিরছি ছোট জায়গা হিসেবে তখন বেশ রাত। পাবগুলোর আশে পাশে যদিও লোকজন ভালোই। বিশ্বাস হচ্ছিলো না গতকালই ছিলাম চেনা কলকাতার রাস্তায়। আর আজকে বিলেতের প্রথম দিনটা কোথা দিয়ে বেড়িয়ে গেলো। এভাবেই সুরুৎ করে ফেরবার দিনটাও চলে আসবে। নাঃ, কালকে থেকেই প্ল্যান করতে বসব।  কি কি করতে হবে, কোথায় কোথায় যেতে হবে, কিই বা দেখার আছে। কোনদিন ভাবিনি বটে এখানে আসব, তবে এসেই যখন পড়েছি, না ঘেঁটে কি আর ফেরা যায়?

Tuesday, January 29, 2019

বাঙালির বিলেত ভ্রমণ - ১ (গোড়ার কথা)



ছোটবেলা থেকে বিলেত যাওয়ার শখ থাকলেও কোনদিন ভাবিনি তা কখনো সত্যি হয়ে উঠতে পারে তার উপর ঝটিতি সফর নয় গিয়ে রীতিমতো বেশ কয়েকদিন থাকা স্বাভাবিক ভাবেই প্রথমে খুব একটা আশা রাখিনি তার উপর মাত্র কয়েকমাস আগের কানাডা যাবার ভিসার আবেদন খারিজ হওয়ার কথা যখন ইউকের ভিসার আবেদনপত্রে লিখছিলাম, ভিতর থেকে কে একটা যেন বলেই চলছিলো – “হয়ে গেলো এসব দেখার পর আর দিয়েছে!

তবে, কথায় আছে না, প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনে অন্তত একজন নারীর অবদান থাকে? এযাত্রা আমার ভিসাকে পিছন থেকে গুঁতিয়ে উৎরে দিল আমার বউয়ের ভিসা তিনি ইতিমধ্যেই বিলেতে বসে চাকরী করার দরুন আমার নির্ভরশীল ভিসাকে আর খোঁচাল না ওরা খোঁচাল না ভালো, কিন্তু দিয়েও দিল একটু বেশিই তাড়াতাড়ি ভেবেছিলাম পেতে পেতে নভেম্বর হয়ে যাবে সেই অনুযায়ী কিছু কাজ সেরে মাসের শেষের দিকে রওনা হবো কিন্তু অনুমতি চলে এলো অক্টোবরের শেষেই নিয়ম হল একমাসের মধ্যে ওদেশে গিয়ে হাজিরা দিয়ে থাকার পারমিট সংগ্রহ করতে হবে আর তার শেষ দিন হল যেদিন যাবো ঠিক হয়েছে, তার পরের দিনই

একেই দুশ্চিন্তা করা আমার বাজে একটা স্বভাব তার উপর এই যদি প্লেন ক্যান্সেল হয়, যদি মুম্বাইতে পরের প্লেন ধরতে না পারি! এইসব উটকো চিন্তা চলতেই থাকলো মাথায় বউ ওদিকে সারাক্ষণ অভয়বাণী দিয়ে চলেছে তবে হাজার আষ্টেক কিলোমিটার দূর থেকে দিলে যা হয় আরকি

দিন এগিয়ে আসছে, আর ওদিকে আমি ইন্টারনেটে আমার প্লেনের নম্বর দিয়ে রোজ দেখে চলেছি ক্যান্সেল বা দেরী করছে কিনা ১০১৫ মিনিটের বেশি দেরি হচ্ছে না দেখে আস্তে আস্তে মনের জোড় বাড়ছে যাবার আগে শেষ কাজ ছিল তিনদিন ধরে পুরুলিয়া চষে সব পুরনো মন্দিরের ছবি তোলা ব্যাগপত্র মোটামুটি গুছিয়ে রেখে দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম তাল কাটল তারপরেই ১০-১৫ মিনিট আস্তে আস্তে ঘণ্টাকে ছুতে আরম্ভ করলো মধ্যে একদিন লন্ডনের প্লেন মুম্বাই ছাড়ার ঘণ্টা খানেক বাদে নামলো কলকাতার বিমান তবে চিন্তা বেশী বেড়ে গেলে যা হয় আরকি ধুত্তোর, যা হবে দেখা যাবে, বলে পাশ ফিরলাম

শেষ পর্যন্ত সব দুশ্চিন্তাকে সপাটে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে কলকাতা এবং মুম্বাই, দুই জায়গা থেকেই প্লেন মোটামুটি ঠিক সময়েই ছাড়ল প্লেনের ঘুপচি শৌচালয় যাতে ব্যবহার না করতে হয়, তাই সিকিউরিটি চেক এর পরেই হালকা হয়ে নেওয়া আমার বরাবরের অভ্যাস এবারেও তার অন্যথা হয়নি তবে প্রায় সারে ঘণ্টা এড়িয়ে থাকতে পারব কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল খাওয়া-দাওয়া, কিছুটা ঘুম আর কিছুক্ষণ খাপছাড়া ভাবে সিনেমা দেখতে দেখতেই দেখি প্লেন ইংলিশ চ্যানেলের মাঝামাঝি বিমান সেবিকা ল্যান্ডিং কার্ড বিলোতে চলে এসেছে যারা ব্রিটিশ নাগরিক নন, তাদের সবাইকেই এটা ভরতে হয় নাম ধাম, পাসপোর্ট নম্বর, কোথা থেকে আসছি, প্লেনের নম্বর এরকম কিছু গতানুগতিক তথ্য প্লেনে বসে ভরে রাখলে সুবিধে

আমার আসন আইলের দিকে পা ছড়ানোর সুবিধার জন্য জানালার ধারে বসি না কিন্তু বিমান এবার নামতে শুরু করেছে মাঝে মাঝে যখন আমাদের দিকে হেলছে নিচে প্রচুর আলো দেখতে পাচ্ছি সকাল হচ্ছে এখন এখানে আস্তে আস্তে প্রচুর গাড়ী, রাস্তা, বাড়ি, সবই স্পষ্ট হতে থাকল আর তারপরই জানালার পাশে চলে এলো মসৃণ একটা রাস্তা শরীর ঝাঁকিয়ে ছুঁয়ে ফেললাম হিথরোর রানওয়ে ভেসে উঠল পাইলটের গলা লন্ডনে সবাইকে স্বাগতম জানাবার সাথে সাথে বলে দিলেন বাইরের তাপমাত্রা এখন

বেশ কিছুটা হেঁটে ইউকে বর্ডার কন্ট্রোলে পৌঁছে দেখি বেশ ভিড় একদিকে ব্রিটিশ অন্যান্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্গত দেশগুলির নাগরিকরা, অন্যদিকে আমাদের মতন বাকিরা সাপের মতন লাইন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে কিছু দূরে দূরে নোটিশ বোর্ড পাসপোর্ট, ল্যান্ডিং কার্ড সব হাতে রাখার নির্দেশ ফুটে উঠছে তাতে প্রথম চমকটা খেলাম যখন দেখলাম তাতে বাংলাতেও লেখা এবং নির্ভুল ভাষা বানানে মনটা খারাপও হয়ে গেলো আমার নিজের শহরটাই এখন অবোধ্য ভাষা আর বিটকেল বানানে ভরে গেছে

দেখতে দেখতে চলে এলো আমার পালা যদিও এটা আমেরিকা নয়, তবুও কড়া কিছু শুনতে হতে পারে ধরে নিয়েই পাসপোর্ট আর ল্যান্ডিং কার্ডটা এগিয়ে দিলাম কাঁচের ওপারের বয়স্ক মোটাসোটা ভদ্রলোক ওগুলো নিয়ে হেসে বলল, গুড মর্নিং শুকনো হেসে আমিও সম্ভাষণ জানালাম ভিসার পাতাটা বের করেই বলল – “তোমার তো আরও কিছু কাগজ থাকার কথা?” (না, বাংলায় বলেনি তাহলে ওখানেই ভির্মি খেতাম)

হাতে বের করাই ছিল, বলামাত্রই কাগজগুলো হস্তান্তর করলাম দেখে নিয়ে সটান আমার দিকে তাকিয়ে বলল – “তোমাকে একটা কাজ করতে হবে

এইরে, আবার কি চায়? ঠোটটা একবার চেটে নিয়ে বললাম – “ইয়েস

স্ট্যাম্প মেরে তোমাকে পাসপোর্ট ফেরত দেবার সঙ্গে সঙ্গে তুমি বাইরে যাবে, এবং একটুও সময় নষ্ট না করে যে পোস্ট অফিস থেকে তোমাকে পারমিট সংগ্রহ করতে হবে তার উদ্দেশ্যে রওনা দেবে

মানে, আমিও তো তাইই করতাম এরকম গোপন অভিযানে পাঠানোর মতন করে বলার মানে কি! একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উত্তর দিলাম – “হ্যাঁ।

দেখো তোমাকে কালকের মধ্যেই এটা নিতে হবে তবে আমি বলব কালকের জন্য অপেক্ষা কর না কালকের পরে ওটা পোস্ট অফিস থেকে আমাদের কাছে চলে আসবে তখন আমাদের কাছ থেকে ওটা সংগ্রহ করা কিন্তু বেশ ঝামেলার হবে ঠিক আছে?”

এক মুখ হেসে বললাম – “নিশ্চয়ই।

ভদ্রলোক দমাস করে স্ট্যাম্প মেরে পাসপোর্ট ফেরত দিয়ে হেসে বলল – “এঞ্জয় ইওর স্টে

আমি ধন্যবাদ জানিয়ে বেড়িয়ে এলাম ব্রিটিশ অতি ভদ্রতা, যা আগামী কয়েক মাসে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যাবে, এটা তার শুরু ছিল

ব্যাগ সংগ্রহ করে বাইরে বেরিয়ে এলাম এদের বিমানবন্দরের নিয়ম আমাদের আগে যেরকম ছিল সেরকম মানে যাত্রী ছাড়াও অন্যরা ভিতরে ঢুকতে পারে সিকিউরিটি চেকের আগে অবধি কোথায় যেতে হলে কোনদিক দিয়ে বেরোতে হবে, সব লেখা আছে লন্ডন শহরে যেতে হলে এখান থেকেই টিউব ধরা যায় তবে আমাকে ধরতে হবে বাস কারণ আমি যাব লন্ডন থেকে আশি মাইল উত্তর পূর্বে ইপসুইচ

বাসে ওয়াইফাই পাবো কিনা জানিনা, তাই এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই থেকেই ভেবেছিলাম বউকে জানিয়ে দেবো কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কানেক্ট হল না দুদিন আগে কেনা নতুন ফোন, সব সেটিংস সড়গড় হয়নি অগত্যা নতুন সিম ফোনে লাগিয়ে বেড়িয়ে এলাম আর সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল হাতে মুখে কেউ ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিলো শুনে গেঞ্জির ওপর একটা হাল্কা জ্যাকেট ছাড়া কিছু চাপাইনি কিন্তু এখানের ঠাণ্ডা ভিজে ঠাণ্ডা

বাস স্ট্যান্ড সামনেই টিকিটে প্ল্যাটফর্ম নম্বর লেখা ছিল সেটাও দেখলাম একদম সামনেরটাই মালপত্র রেখে দাড়িয়ে হাত ঘষতে লাগলাম একজন মহিলা ব্যস্ত ভাবে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছিল আমাকে দেখে এগিয়ে এল

ঠাণ্ডা লাগছে না? কোথায় যাবে?”

আমি হেসে জবাব দিলাম, “খুব বেশি না, তবে হাত জমে যাচ্ছে যাব ইপসুইচ

তোমার বাস দেড় ঘণ্টা পরে যাও যাও ভিতরে গিয়ে বস আমরা বাস এলে ডেকে দেব

এতক্ষণে চোখে পড়ল পাশেই একটা কাচের বিশ্রামঘর মহিলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঢুকে পড়লাম এবার নতুন সিমের দিকে নজর দেওয়া যাক খুচখাচ চেষ্টা চলতে থাকল কিন্তু সে আর জ্যান্তই হয়না শেষে বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিলাম

দেড় ঘণ্টা কম সময় না কিন্তু তাও একসময় কেটে গেলো দূর থেকে বাসের নম্বর দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছিলাম আগের মহিলার ডিউটি মনে হয় শেষ, একজন কমবয়সী মেয়ে দরজা ফাঁক করে ইপ্সুইচ বলে ডেকে গেলো

বাস এসে দাড়াতে চালক নেমে এল এক বিশাল-বপু মহিলা একবার টিকিট আর একবার আমার ব্যাগ দুটো দেখে নিয়ে, এক ঝটকায় একটা তুলে নিপুণভাবে বাসের পেটে চালান করে দিল দ্বিতীয়টা আমি তুলতে যাচ্ছিলাম, ইশারায় বারণ করে একইভাবে সেটাও ঢুকিয়ে দিল ভদ্রতা করে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম বটে তবে যা ক্ষমতা, মনে হল আমার ২৩ কিলোর ব্যাগ তো কিছুই নয়, এই ১০০ কিলোর দেহটাও একইভাবে হেসে খেলে চালান দিতে সক্ষম


আমি ছাড়া আর পাঁচ ছয়জন যাত্রী নিয়ে ঘড়ি ধরে ছেড়ে দিলো বাস সাড়ে তিন ঘণ্টার যাত্রা আবার মোবাইলের সিম নিয়ে পড়লাম এবার হল অবশেষে ইন্টারনেট চালু করতেই দমাদ্দম ঢুকতে লাগল বউয়ের ওয়াটসাপ মেসেজ সাথে মিসড কলের এসএমএস সব খবর দিয়ে এবার আরাম করে বসে বাইরে তাকালাম দুইধারে সবুজ মাঠ আবার মাঝে মাঝে ছবির মতন বাড়ি কিন্তু বাস যে বড্ড আস্তে চলছে চার মাস প্রায় হতে চলল বউটাকে দেখিনি বাবা ইপ্সুইচ, তুমি আর কতদূর?